সভ্যতার নবীন সংকট: এক ফোঁটা জল

0
116

কৃষ্ণকান্ত দাস: সভ্যতার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছে বৈষম্যতা, মানুষে মানুষে বিভেদ উঠেছে চরমে। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে বর্ণবৈষম্য, জাতিভেদ প্রথার প্রকটতা যত কমছে, বেড়ে উঠছে নিত্যনতুন বৈষম্যতা। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে দেশের মূল দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জলসংকট। যার প্রভাব পড়েছে সমাজের নানান স্তরে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়েও দেশ বিভাজিত হয়ে গিয়েছে দুটি ভাগে। যেখানে প্রকট হয়েছে ধনী ও দরিদ্র, দুটি স্তর। এই বিভাজনের ছবিই উঠে এলো দিল্লির রাস্তায়।

দিল্লির চকমকি রাজপথের নিয়ন আলোর পিছনেই রয়েছে ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঢাকা অজস্র বস্তি। সেখানকার বাসিন্দাদের নিত্যদিনের সমস্যায় তালিকাভুক্ত হয়েছে জলসংকট। একই সমস্যা যদিও ঢুঁ মেরেছে প্রাসদে থাকা বাবুদের আঙিনাতেও।

টাকা থাকলে কীই না হয়। ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের শ্লোগানই বলে, ‘পয়স্যা বলতা হে’। এমন হাহকারের দিনে দাঁড়িয়ে উক্তিটি হয়তো সত্যিই খুব প্রাসঙ্গিক। তাই টাকার ভাষা হয়তো বুঝেও নিতে পারে সমাজের বিশেষ কিছু বিত্তশালী শ্রেণী সম্প্রদায়। যার জেরেই হয়তো মাসে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা খরচা করে সহজেই ভরে যায় বাড়ির স্নানাগার। রান্না ঘরে অধিষ্ঠিত হয় ফিল্টারের চেম্বার কিংবা পোষ্যর স্নানের গামলা। অঝরে ঝরতে থাকে চার চাকা ধোয়ানোর জল অথবা যত্নে সাজানোর বাগিচার উপচে পড়া টব।

অপরদিকে বস্তিতে থাকা মানুষগুলির লক্ষ্মীর ঝাঁপি ভেঙে উঠে আসা অর্থের বিনিময়েও জোটে না গোটা পরিবারের গলা ভেজানোর মতো জল। বালতি হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ঘন্টার পর ঘন্টা লম্বা লাইনে। যদিও বা দু-চার ফোঁটা ভাগ্য করে মেলে, তার মাশুল দিতে হয় চড়া হারে। সরকারী গাড়ি যত শীঘ্র জলসরবরাহ করে, ততই দ্রুত গতিতে উঠতে থাকে তার মূল্যমিটারের কাঁটা।

এদের জন্য আহ উফ করার লোকের অভাব নেই। সমবেদনায় কাতর জনপ্রতিনিধি বা আইন নির্মাতারা এই সংকট মেটানোর তাগিদে নিত্যদিন গলা ফাটাতে দেখা যাচ্ছে সংসদে। কিন্তু বাস্তব যেন পুরোটাই আলাদা এক ছবি। ঠিক যেমনটা মনে হয় শীততাপ নিয়ন্ত্রিত মেঝে থেকে পা বাড়িয়ে খরা পড়া জমিতে পা রাখলে।

‘মন কি বাত’ বলতে গিয়ে থর থর কণ্ঠে দেশের প্রধানমন্ত্রী তাঁর ‘মিত্র’দের উদ্দেশ্যে বলেন, দেশজুড়ে এই চরম বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে সকলের উচিত জল সংরক্ষণের বিষয়ে সজাগ হওয়া। কিন্তু তাঁর সমব্যথিত ওষ্ঠ হতে একটি বারও নির্গত হল না তাঁর তথাকথিত দেশের ‘চৌকিদার’ পরিবারগুলির সুখ স্বাচ্ছন্দ্য বিরত রেখে জল সরবারহে হ্রাস টানার কথা। যদিও বিন্দুমাত্র অবাক হওয়ার বিষয় নয় এটি। দিনের পর দিন ধরে প্রধানমন্ত্রীর প্রিয় দেশবাসীরা এই প্রথাতেই অভ্যস্থ। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, জল সংরক্ষনের তাগিদে দিল্লির সরকারী জেলা সেনাবাহিনী ক্যান্টনমেন্ট এলাকার কথা। সেখানে প্রতিদিন জনপিছু বরাদ্দ জলের পরিমাণ ৩৭৫ লিটার। অথচ সেখান থেকে কয়েক কিলোমিটার দূর সঙ্গম বিহারের বাসিন্দাদের জন্য জনপ্রতি বরাদ্দ মাত্র ৪০ লিটার। এহেন দ্বিচারিতা অবশ্য নতুন নয়। এই প্রথা চলে আসছে দশরথের রাম রাজের সময় থেকে। আজ নতুন রাম রাজের স্বপ্নের ফেরিওয়ালার রাজত্বে এমন বৈষম্যতা কিঞ্চিৎ অস্বাভাবিক নয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দিল্লির জলের পাইপলাইনের দখলদারি কর্পোরেশনের হাতে নয়। বরং তা রয়েছে কিছু মাফিয়া ও তথাকথিত চৌকিদারের হাতে। দূরদৃষ্টির প্রখরতা যদি একটু বাড়ানো যায়, তবে আরও গভীরে গিয়ে দেখা যাবে দিল্লির সঙ্গম বিহার থেকে ২০ মাইলে দূরের একটি গ্রাম। যেখানে সাধারণ মানুষ দিনযাপন করছে চাতকের মতো জলের অপেক্ষারত হয়ে। এলাকার বাসিন্দাদের দাবি, বিলাসিতার নেশায় চুর হয়ে শহুরে বাবুদের বাড়িয়ে তোলা কৃত্রিম গরমের শিকার তাঁরা। কারণ শুকিয়ে গিয়েছে নদ-নদী, পুকুর-জলাশয়। শুকিয়ে গিয়েছে গ্রামের পানীয় জলের সকল সংস্থান। যৎসামান্য যা বেঁচে আছে তা সম্পূর্নই গরলে পরিণত হয়েছে। সরকারী গাড়ির অপেক্ষায় দিন কাটছে গ্রামবাসীদের। ঘটনা শুধু এ বছরের নয়, প্রতিবছর এই জলসংকটের মুখ দেখে দিল্লি। স্থানীয়দের দাবি, আগের মরসুমে তিনজন প্রাণ হারিয়েছে জলসংকটের জেরে। গ্রামের অন্তঃসত্ত্বা মহিলা থেকে শুরু করে প্রতিবন্ধী শিশু প্রত্যকেই ছুটতে হয় বালতি হাতে কয়েক মাইল দূরে শুধুমাত্র জলের আশায়।

এমন পরিস্থিত শুধুই দেশের একটি প্রান্তেই নয়। বরং বলা যতে পারে দেশের অধিকাংশ জায়গায় হাল বেহাল। কিছুদিনে আগে সংবাদ শিরোনামে আসে মহারাষ্ট্রের একাধিক গ্রাম। গ্রামের লোকেদের জল আনতে যেতে হয় ট্রেনে চেপে, বড়দের পাশাপাশি পরিবারের ছোটরাও সমানতালে জল বয়ে নিয়ে আসে। তেমনই একজন হল বছর বারোর সিদ্ধার্থ। ১৪ কিলমিটারের বেশি পথ পেরিয়ে মুকুন্দওয়াড়ি থেকে হাতে কলসি-বালতি নিয়ে ঔরাঙ্গাবাদ পৌঁছে জল ভরে পরিবারের জন্য নিয়ে আসে। বিনা টিকিটে ট্রেনে সওয়ারির জন্য প্রতিনিয়তই লাঞ্ছিত হতে হয় অন্যান্য যাত্রীদের কাছে। তবুও এই রোজনামচার জীবনের থেকে মুক্তি নেই। গ্রামের আশপাশ থেকে জল আনার কোনো ব্যবস্থা নেই।

আনুমানিক দু’লক্ষ লোকের বসবাস দিল্লির ভালসায়া এলাকায়। যাদের মধ্যে অধিকাংশ বাসিন্দারা ভুগছেন পেটের ব্যামোয়। জল থেকে সংক্রামিত হওয়া এই রোগের শিকার গোটা এলাকা। বেসরকারী এক ব্রিটিশ সংস্থার করা সমীক্ষায় উঠে এসেছে, ভারতের ১৬৩ কোটি জনগণের মধ্যে মাত্র ১২ শতাংশ দেশবাসী পরিশ্রুত পানীয় পান করে। উত্তর-পশ্চিম ভারতের থেকেও খারাপ অবস্থা দক্ষিণ ভারতের। একবিন্দু জলের দাম বুঝতে পারছে প্রতিটি প্রাণী। গ্রামের মানুষ জনের পাশাপাশি তৃষ্ণার্ত হয়ে ঘুরছে পশুপাখিরও। সভ্যতার এই নব্য সংকটে দাঁড়িয়ে যদি মানুষ ভুলে যায় সে সমাজবদ্ধ জীব তাহলে এর থেকে বেশী মর্মান্তিক কিছু হতে পারে না। একলা চলো নীতি নিয়ে চলতে থাকলে খড়াপড়া পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব অবলুপ্ত হতে খুব বেশী বিলম্ব করতে হবে না।

এমন ঘটনা অহরহ ঘটতে দেখা যায় দেশের নানা প্রান্তে। যার মধ্যে অন্যতম নজির গড়েছে রাজস্থান। আজও সেখানে জারি রয়েছে বর্ণাশ্রম। ঘটনাটি রাজস্থানের একটি গ্রামের, গ্রামটিতে রয়েছে একটি মাত্র পুকুর সেই পুকুরের জল ব্যবহার করার অধিকার শুধুমাত্র উচ্চবর্ণের মানুষের। নীচুজাতির কেউ সে পুকুর থেকে জল নিতে ধরা পড়লে জোটে অভিনব ধরণের শাস্তি। বিশ্ববরেণ্য পরিচালক সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘সৎগতি’ ছায়াছবিতে দেখিয়ে গিয়েছেন কীভাবে সমাজের নিপীড়িত তথাকথিত পিছিয়ে পড়া এই মানুষদের লড়াই করে জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়। আজ এই সকল মানুষেদের কাছে পানীয়ের জল না থাকলেও কেবল এই সকল বার্তাগুলিই পিপাসা মেটাচ্ছে। হয়তো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের এমন সুদিনের কথাই বলেছিলেন, হয়তো এমন অনাহার জলকষ্ট দিয়েই তিনি গড়ে তুলতে চান দেশের আগামী ভবিষ্যৎদের। ঠিক যেমনটা চেয়েছিলেন হীরক রাজা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here