ডেস্ক: অনেক টানাপোড়েন, তর্ক-বিতর্কের পর অবশেষে বদল গেল পশ্চিমবঙ্গের নাম৷ স্বাধীনতার ৭০ বছর পেরিয়ে এবার পশ্চিমবঙ্গের নাম হতে চলেছে ‘বাংলা’৷ বৃহস্পতিবার বিধানসভার বাদল অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়ে গেল এই প্রস্তাব৷ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে রাজ্য সরকারের আনা প্রস্তাবে সমর্থন করেন বিরোধী বাম-কংগ্রেস-বিজেপি বিধায়করা৷ কেন্দ্র বাংলা-হিন্দি-ইংরেজিতে তিনরকম নাম দেওয়ায় প্রস্তাব আগেই খারিজ করে দিয়েছিল। তাই এদিন বিধানসভায় তিনটি ভাষাতেই রাজ্যের নাম ‘বাংলা’ রাখার নাম প্রস্তাব করা হয়৷

২০১৬-র অগাস্টে এই প্রস্তাব সর্বপ্রথম বিধান সভায় পাস হয়েছিল। তখন প্রস্তাবের পক্ষে ১৮৯ ভোট পড়ে আর বিপক্ষে পড়ে ৩১ ভোট। কিন্তু কেন্দ্র সেই প্রস্তাব রাজ্যের কাছে ফেরত পাঠায়৷ কেন্দ্রের বক্তব্য ছিল, বাংলা, ইংরাজি ও হিন্দি- তিনটি ভাষাতেই একই নাম হোক। সেই মতো বৃহস্পতিবার নতুন করে বিধানসভায় বাংলা নামের প্রস্তাব পেশ করে রাজ্য সরকার। ১৭৯ ধারায় প্রস্তাবটি গৃহীত হয় বিধানসভায়। এখন শুধু কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক সিলমোহরের অপেক্ষা৷ এবং সেই অনুমোদন খুব শ্রীঘ্র পাওয়া যাবে বলে মনে করা হচ্ছে৷

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে বিধানসভার বিশেষ অধিবেশনে নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব পেস করেছিলেন সংসদবিষয়ক ও শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়। অনেক তর্ক বিতর্কের পর ভোটাভুটিতে প্রস্তাব পাস হয়। নাম পরিবর্তেনর যৌক্তিকতা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘যুগের প্রয়োজনে অনেক সময় সিদ্ধান্ত বদল করতে হয়। আমরা সেই পথে এগিয়ে আমাদের রাজ্যের নাম বাংলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কবিগুরুর নানা লেখায় ফুটে উঠেছে এই বাংলা নামের কথা।’ মুখ্যমন্ত্রী ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, কেন্দ্রের বিভিন্ন বৈঠকে এই রাজ্য বঞ্চিত হয়৷ রাজ্যের বক্তব্য সঠিকভাবে পেশ করা যায় না৷ কারণ, বর্ণাক্রম (alphabet) অনুযায়ী, সেখানে বিভিন্ন রাজ্যের প্রতিনিধিদের বক্তব্য শোনা হয়৷ সেক্ষেত্রে west bengal অনেক পিছিয়ে থাকে৷ কখনও কখনও তো সময়ের অভাবে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিনিধির বক্তব্য শোনাই হয় না৷

পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তন নিয়ে রাজ্য মন্ত্রীসভায় দুটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। ‘বাংলা’ অথবা ‘বঙ্গ’। তবে অধিকাংশের মত ছিল, ‘বাংলা’ নামের পক্ষে। সেই নামকেই অনুমোদন করেন মমতা। এরপর তা পাস করা হয়েছিল বিধানসভা অধিবেশনে। এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য তা পাঠানো হয়েছিল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের দফতরে৷ কিন্তু সেই প্রস্তাবে বলা ছিল, বাংলায় রাজ্যের নাম হবে ‘বাংলা’, হিন্দিতে ‘বাঙ্গাল’ এবং ইংরাজিতে ‘বেঙ্গল’৷ আর সেখানেই আপত্তি ছিল কেন্দ্রের৷ তা প্রস্তাব খারিজ করে সব ভাষাতেই একটি নাম পাঠাতে বলা হয়৷

‘বাংলা’ নাম নিয়ে রাজনৈতিক মহলে অনেক প্রশ্ন উঠেছিল। তখন কেউ কেউ বলেছেন, প্রতিবেশি রাষ্ট্রের নাম বাংলাদেশ। রাজ্যের নাম ‘বাংলা’ হলে সমস্যা হতে পারে। সেই যুক্তি উড়িয়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দেন, ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল ঠিকই আছে। পাশে বাংলাদেশ তো একটা দেশ। আর রাজ্যের নাম বাংলা হলে অসুবিধা কোথায়? পাকিস্তানেও পঞ্জাব আছে, আমাদের দেশেও পঞ্জাব আছে।’

প্রসঙ্গত, বিতর্ক এড়াতে মুখ্যমন্ত্রী মনে করিয়ে দেন, এর আগেও দেশের বিভিন্ন রাজ্যের ও শহরের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। সংযুক্ত প্রদেশের নাম পরিবর্তন হয়ে হয়েছে উত্তর প্রদেশ, হায়দরাবাদের পরিবর্তে হয়েছে অন্ধ্র প্রদেশ, মধ্য ভারতের নাম হয়েছে মধ্যপ্রদেশ, উত্তরাঞ্চলের পরিবর্তে হয়েছে উত্তরাখন্ড, উড়িষ্যারপরিবর্তে হয়েছে ওড়িশা, ত্রিবাঙ্কুর-কোচিনের পরিবর্তে কেরালা, মাদ্রাজের পরিবর্তে চেন্নাই এবং মহীশুরের পরিবর্তে রাজ্যের নাম হয়েছে কর্ণাটক। বোম্বের পরিবর্তে হয়েছে মুম্বই৷ বেঙ্গালোর পরিবর্তিত হয়ে এখন বেঙ্গালুরু৷

তবে এই প্রথম নয়, এর আগেও রাজ্যের নাম বদল চেয়ে দু’বার প্রস্তাব গিয়েছিল। ১৯৯৯ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য রাজ্যের নাম ইংরেজিতে ওয়েষ্ট বেঙ্গলের পরিবর্তে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ রাখার প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সেই প্রস্তাব খারিজ করে দেয় কেন্দ্র৷

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here