মহানগর ওয়েবডেস্ক: বহুদিন হল, তৃণমূলের নেতারা এক এক করে দলের বিরুদ্ধে মুখ খোলা শুরু করেছেন। আমফানের পর দলের বিরুদ্ধেই বিস্ফোরক অভিযোগ এনেছিলেন ক্রেত সুরক্ষা মন্ত্রী সাধন পাণ্ডে। এবার সেই তালিকায় নাম লেখালেন বনমন্ত্রী রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়। নাম না করেই দলের বিরুদ্ধে রীতিমতো বোমা ফাটিয়েছেন ডোমজুড়ের বিধায়ক। তাঁর অভিযোগটা খুব স্পষ্ট, ‘কাজ করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু করতে দেওয়া হয়নি।’ দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত ঘাসফুল নেতৃত্বকে পরামর্শ হিসেবে তিনি বলেছেন, চুনোপুটিদের ধরে কিছু হবে না। যারা বড় এবং আসল মাথা এর পিছনে রয়েছে তাদের সামনে আনতে হবে।

বাংলার প্রথম সারির এক সংবাদ মাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেই এহেন তোপ দেগেছেন প্রাক্তন সেচমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, ‘যারা সত্যি হয়তো যোগ্যতার সঙ্গে কাজ করতে চায়, অনেক জায়গায় হয়তো তাদেরকে ঠিকভাবে সেই সুযোগটা করে দেওয়া হয় না। বা যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুযায়ী যে মাপকাঠিতে বিচার করা উচিত, তারা সেভাবে বিচার্য হয় না। অস্বীকার করব না। কিছুটা হলেও আমার ভিতর চাপা আক্ষেপ, দুঃখ, বেদনা রয়েছে। আমি তো মানুষের জন্য কাজ করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমায় করতে দেওয়া হয়নি।’

তৃণমূলের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে উঠতে থাকা একাধিক দুর্নীতি সম্পর্কেও জানতে চাওয়া হয়েছিল বনমন্ত্রীর কাছে। জবাবে তিনি বলেন, ‘দল এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে গেলে সার্বিকভাবে দুর্নীতিকে দূর করতে হবে। শুধু কয়েকজন চুনোপুটিকে দেখিয়ে যদি দুর্নীতি রোধ করতে যাই সেটা হবে না। প্রচুর রাঘব-বোয়াল, রুই-কাতলা, ইলিশ আছে। তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।’ প্রসঙ্গত, দিনদুয়েক আগেই হাওড়ায় আমফান দুর্নীতিতে জড়িত পঞ্চায়েত স্তরের তিন তৃণমূল নেতাকে দল থেকে সাসপেন্ড করার ঘোষণা করেন অরূপ রায়। মুখে কিছু না বললেও রাজীব যে খুব স্পষ্টত এই ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করেছেন তা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভা গঠন হওয়ার পর থেকে যে কয়েকজন মন্ত্রী কেবল কাজের উপর ভিত্তি করে নজর কেড়েছিলেন, রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় তাদের মধ্যে অন্যতম। সরকারের প্রথম দফায় সেচমন্ত্রী হওয়া রাজীবের নিরলস কাজের নিদর্শন দেখতে পাওয়া গিয়েছিল উত্তর থেকে দক্ষিণবঙ্গের সর্বত্র। খুব অল্প সময়েই নিজের কাজ এবং ব্যক্তিগত ক্যারিশ্মায় আলো ছড়িয়েছিলেন তিনি। ফলে রাজীব অনুগামীরা আশায় বুক বেঁধেছিলেন, পরবর্তী সময়ে হয়তো মন্ত্রিসভায় আরও ওজনদার মন্ত্রক পেতে পারেন তাদের নেতা। কিন্তু বাস্তবে সেটা হয়নি। ‘তৃণমূলী সংস্কৃতি’র সঙ্গে ওয়াকিবহাল যারা তাদের আশঙ্কাই সত্যি পরিণত হয়েছিল। রাজীবের ছুটে বেরিয়ে কাজ করা ও প্রচারের আলো কেড়ে নেওয়া দেখে যারা কানাঘুষো করেছিলেন যে, ‘এবার ওর ঘাড়েও কোপ পড়ল বুঝি।’ অতঃকিম, সেচ থেকে ডিমোশান। বনমন্ত্রী হয়ে গেলেন রাজীব।

চাপা ক্ষোভটা তখন থেকেই ছিল তাঁর ভিতরে। এদিন সেই ক্ষোভেরই একপ্রকার উদ্গীরণ হল বলা চলে। তবে ক্ষোভের এই লাভা যে কোনও দিন আগ্নেয়গিরি স্বরূপ বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। তা এখন থেকেই টের পেতে শুরু করেছে তৃণমূল। রাজীবের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে মন্ত্রী অরূপ রায়কে তাই বলতে শোনা গিয়েছে, ‘দলের অভ্যন্তরীণ বিষয় দলেই জানানো উচিত। এভাবে প্রকাশ্যে বলা ঠিক নয়। এতে দল অস্বস্তিতে পড়তে পারে।’ অন্যদিকে পুরমন্ত্রী তথা হাওড়া জেলা তৃণমূল পর্যবেক্ষক ফিরহাদ হাকিম এই বিষয়ে বলেন, ‘দলের বিষয় দলের মধ্যেই থাকলেই ভালো।’ ফলে তৃণমূল যে গোটা বিষয়টা নিয়ে অস্বস্তিতে পড়ে গিয়েছে তা বুঝতে আর বাকি নেই।

অন্যদিকে রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা শুনে মুচকি হাসি ফুটেছে বিজেপি শিবিরে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বঙ্গ বিজেপির এক নেতা তো বলেই দিলেন, ‘আসলে উনি কাজের মানুষ। বুঝতে পারছেন ওখানে থেকে কাজ করাও সম্ভব না। একুশের পর আর করতেও পারবেন না। তাই আগেভাগে সব বলে দিচ্ছেন।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here