amazon

রাহুলদেব বিশ্বাস: আমাজনের জঙ্গলের অনেকাংশই বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত মানুষের স্পর্শ থেকে দূরেই ছিল। পরিবর্তনটা আসে ১৯৬১-তে ব্রাজিলের শেষ বামপন্থী রাষ্ট্রপতি ‘জাও বেলচিয়র মারকস গোলাল্ট’ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে। ব্রাজিলের ডানপন্থী সরকার আমাজনের বৃষ্টি অরণ্য জনসাধারণের কাছে অনেকটাই মুক্ত করে দেয়। বৃষ্টি অরণ্যে জুম কৃষিপদ্ধতি বহুলপ্রচলিত হয়ে পড়ে। জুম একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি, বিশেষ করে যেখানে অনেক জমি বা ফাঁকা জায়গা আছে। এই পদ্ধতিতে কোনও একটি জমিতে কিছু বছর চাষ করার পর তার উর্বরতা কমে গেলে তার পাশের জঙ্গলময় জমির জঙ্গল কেটে তাতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়; আগুনে জঙ্গলের লতাপাতা ডালপালা পুড়ে মাটিতে মিশে উর্বর জমি তৈরি হয়, ফলে নতুন উর্বর জমি কৃষকরা পেয়ে যায় এবং পুরনো জমি ছেড়ে নতুন জমিতে কয়েকবছর চাষবাস করে, পুরনো জমিতে আবার কয়েকবছরে জঙ্গল তৈরি হয়ে যায়। এই পদ্ধতি বারবার পুনরাবৃত্ত হয়। আমাজনের বৃষ্টি অরণ্যে আগুন লাগা বা দাবানলের এটাই অন্যতম কারণ। অর্থাৎ আমাজনের এই আগুন আজকের ঘটনা নয় বহুবছর ধরে চলে আসছে। এটি পরিবেশের জন্য ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর প্রক্রিয়া নয়, যদি জুম চাষের স্বাভাবিক নিয়ম মানা হয়, কিন্তু জঙ্গলদখলই যখন উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়, তখন ক্ষতি তো অবশ্যই।

amazonজুম চাষের সাথে সাথে আর একটি প্রক্রিয়া বিংশ শতকের মাঝামাঝি থেকে চলে আসছে, তা হল পশুপালন। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপে মাংসের চাহিদা প্রতিদিন বাড়ছে। ব্রাজিলের গরুর মাংসের মত মাংসের চাহিদা সমস্ত পৃথিবীতে বিপুল, তাই আমাজনের অরণ্য ধ্বংস করে প্রতিদিন নতুন নতুন পশুচারণ ক্ষেত্র তৈরি করা হচ্ছে। সাথে পশুদের খাদ্যের জন্য বিপুল জমিতে সোয়াবিন চাষ করতে হচ্ছে, সোয়াবিন চাষে ব্রাজিল দ্বিতীয়, আমেরিকার পর। আমাজনের যে জঙ্গল ১৯৭০-এর পর থেকে ধ্বংস করা হয়েছে, তার ৭০ শতাংশই পশুপালনের জন্য। বিজ্ঞানীদের মতে, এই দুই প্রক্রিয়ায় বৃষ্টি অরণ্য ধ্বংসের ফলে অরণ্য ধ্বংসকে আরও ত্বরান্বিত করছে। এর পিছনে আছে প্রকৃতির একটি অসাধারণ প্রক্রিয়া। নাসার ক্যালিপসো (CALIPSO) কৃত্রিম উপগ্রহ চিত্রকে বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, সাহারা মরুভূমি থেকে প্রতিবছর ১৮২ মিলিয়ন টন ধুলো উড়ে যায় পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে, তার মধ্যে ২৭.৭ মিলিয়ন টন ধুলো আমাজনে উড়ে আসে। এই ধুলোয় ফসফরাস ও আয়রনের মত নিউট্রিয়েন্টস থাকে, যা গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও কৃষিকাজের জন্য খুবই দরকারি। বৃষ্টি অরণ্য প্রচুর বৃষ্টি ডেকে আনে, বৃষ্টি বেয়ে আমাজনের আকাশে ভাসতে থাকা ফসফরাস ও আয়রনযুক্ত ধুলো মাটিতে নেমে এসে মাটিকে উর্বর করে তোলে। বৃষ্টি অরণ্য প্রতিনিয়ত ধ্বংসের ফলে বৃষ্টি কমে যাচ্ছে, তাই মাটিও উর্বর ধুলো পাচ্ছে না, ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে– মানুষের প্রয়োজন মেটাতে আরও বেশি বেশি জঙ্গলকে পুড়িয়ে কৃষিজমিতে পরিণত করতে হচ্ছে।

amazon১৯৭০-এর পর জঙ্গলধ্বংসের প্রক্রিয়া নতুন মাত্রা পায়। আমাজন অববাহিকায় খনিজ তেল খুঁজে পাওয়া যায়। বৃষ্টি অরণ্যের একাধিক স্থানে তৈল খনন প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে ট্রান্স আমাজোনিয়ান হাইওয়ের কাজ শুরু হয়ে যায়, যা আমাজনের বৃষ্টি অরণ্যের জন্য গোদের উপর বিষফোঁড়া হিসাবেই দেখা দেয়– জঙ্গলের আগুন আরও বাড়তে থাকে। ২০০০ সালের মধ্যে সমগ্র প্রক্রিয়া আরও দ্রুততা পায়। যদিও ২০০২-এর পর থেকে আমাজনের বৃষ্টি অরণ্যের সংরক্ষিত অঞ্চলের অঞ্চলকে বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। কারণ ইতিমধ্যে জঙ্গলধ্বংসের কুপ্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া শুরু করে দিয়েছে আমাজন অববাহিকার নয়টি দেশ। বৃষ্টি অরণ্যের ধ্বংসের ফলে ২০১৪-তে ব্রাজিলে মারাত্মক খরা দেখা দেয়, যা পরবর্তী বছরগুলিতেও প্রভাব ফেলে। জঙ্গলধ্বংসের সাথে সাথে আমাজনের উরারিনা উপজাতির মত জনগোষ্ঠী বাস্তুহারা হতে থাকে। ব্রাজিল না পারলেও ইকুয়েডর তাদের দেশের বৃষ্টি অরণ্যের জমি তৈল খননের জন্য বেসরকারি সংস্থাকে বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে, তাদের দেশের ১,৮০০ বর্গকিমি অঞ্চলের আমাজন বৃষ্টি অরণ্যে খনিজ তৈল অনুসন্ধানকার্য একেবারে বন্ধ করে দেয়।

amazon২০১৩-তে আমাজনে আগুনের সংখ্যা ছিল ৩০ হাজারের কাছাকাছি, ২০১৪-তে সেটা অনেকটা বেড়ে ৫০ হাজারে পৌঁছে যায়, তা ২০১৫-তেও একই থাকে। ২০১৬-তে আগুনের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৫ হাজারের ওপর। ২০১৭-তে দাবানল আবার কমে যায় ৫০ হাজারে, ২০১৮-তে সর্বনিম্ন হয় ৩০ হাজার। ২০১৯-এ আবার দাবানল ঊর্ধ্বগতি পায়, প্রায় ৭৫ হাজারে পৌঁছায়। নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকরা ঝুম চাষের ত্বরণ, বিপুল পশুপালন ও খনিজ তৈল খননকে এই আগুনের কারণ হিসাবে চিহ্নিত করলেও কিছু ভিন্নমতও আছে; আন্তর্জাতিক মিডিয়া, পরিবেশকর্মী, বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মনে করছেন, আগুনের পিছনে ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি জেয়ার বোলসোনারো। ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি অবশ্য অন্য তত্ত্ব হাজির করেছেন, তার মতে, বিরোধীরা আমাজনের জঙ্গলে আগুন লাগাচ্ছে তাকে বদনাম করার জন্য। যদিও এইসব বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে কেউ কোনও প্রমাণ দেননি। তবেই ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক চাপ এতটাও জোরালো হয়ে উঠেছে যে, অববাহিকার নয়টি দেশ আগুন নেভাতে তৎপর হয়ে উঠেছে। বলিভিয়া আগুন নেভাতে এয়ারট্যাঙ্কার (B747-400 SuperTanker) ব্যবহার করছে। ব্রাজিল আগুন মোকাবিলাতে সেনাবাহিনী নামিয়ে দিয়েছে। আসছে আন্তর্জাতিক সাহায্যও।

amazonআমাজনের বৃষ্টি অরণ্যের আগুন কোনও দুর্ঘটনা নয়, এটি বহুবছর ধরে চলে আসা একটি প্রক্রিয়াও, যা সমস্ত অববাহিকার জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক চেতনার সাথে মিশে আছে। তাই তাৎক্ষণিকভাবে আগুন নেভানোটা কোনও স্থায়ী সমাধান নয়। আবার এই আগুনের বিরুদ্ধে হিটলারের নাৎসি আন্দোলনের মত আন্দোলনও কাজের নয়। আমাজনের আগুন নেভাতে গেলে সবচেয়ে জরুরি অববাহিকার মানুষের ভিতর আফ্রিকা ও চিনের মত ‘গ্রিন ওয়াল মুভমেন্ট’-এর মত গঠনমূলক আন্দোলন। তা হলেই পৃথিবীর প্রাকৃতিক ‘গ্রিন ওয়াল’ আমাজনের বৃষ্টি অরণ্য যেমন রক্ষা পাবে, তেমনই অরণ্যের পূর্বের জমি পুনরুদ্ধার করা যাবে। শুধু আমাজনের বৃষ্টি অরণ্য নয়, সমস্ত পৃথিবীতেই বিভিন্ন উপায়ে অরণ্যনিধন চলছে। তার ফলও আমরা ভুগতে চলেছি, প্রায় অর্ধেক পৃথিবী সমুদ্রের জলস্তরের বৃদ্ধিজনিত কারণে ডুবে যেতে বসেছে। তাই শুধু আফ্রিকা, চিন বা আমাজন অববাহিকা নয়, সমস্ত পৃথিবীতেই ‘গ্রিন ওয়াল মুভমেন্ট’ এইমুহূর্তে অপরিহার্য। আমাদের রাজ্যর পরিবেশকর্মীরা ইতিমধ্যে উপকূলবর্তী জেলাগুলিতে ‘গ্রিন ওয়াল’ নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। রাজ্যে তৈরি হয়েছে ‘দ্য গ্রিন ওয়াল কমিটি’। দ্য গ্রিন ওয়াল কমিটি আগামী ২২ সেপ্টেম্বর রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে ‘গ্রিন ওয়াল’কে বাস্তবায়িত করার জন্য সেমিনারের আয়োজন করেছে। আসুন, সকলে আমাজনের পাশে দাঁড়াই, পাশে দাঁড়াই আমাদের সুন্দরবনের, আমাদের পৃথিবীর– এক নিরাপদ সবুজ পৃথিবীর জন্য।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here