dark web

সৌরভ দাস: একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমরা ইন্টারনেট ছাড়া ভাবতেই পারি না। কোনও অচেনা জায়গায় গিয়ে হারিয়ে গিয়েছেন, ভয় নেই, হাতেই আছে আপনার স্মার্টফোন, যা দিয়ে আপনি আপনার সঠিক লোকেশনে অনায়াসেই পৌঁছে যেতে পারেন। বা অফিসের চাপে পুজোর শপিং করতে যাবার মতো সময় নেই, তাই অনলাইন শপিং করে ঘরে বসেই আপনি আপনার পছন্দ মত জামাকাপড় হাতে পেয়ে যান। কিন্তু আপনারা ভাবছেন আজ আপনাদের কেন এই কথা আমরা বলছি, তা হলে আপনাদের আর অপেক্ষা না করিয়ে আসছি আমরা মূলকথায়।
মূলত আমরা যে এই ইন্টারনেট ব্যবহার করি, তা ঠিক ভাসমান বরফের মতো। যতটা দেখি উপরে ভেসে রয়েছে, তার দু’ভাগ জলের নিচে রয়েছে। বুঝতে পারলেন না নিশ্চয়ই। তা হলে আর হেঁয়ালি না করে মোদ্দাকথায় আসছি। আমরা যে ইন্টারনেট ব্যবহার করি, তা মূলত তিনভাগে বিভক্ত। ১. সারফেস ওয়েব, ২. ডিপ ওয়েব এবং ৩. ডার্ক ওয়েব।

কী এই সারফেস ওয়েব? আমরা প্রতিনিয়ত যে সমস্ত সার্চ ইঞ্জিন (গুগল, ইয়াহু, বিং, ইয়ান্ডেস্ক) ব্যবহার করি, কিছু জানার জন্য বা কোনও ওয়েব পেজকে সার্ফ করার জন্য, তাকেই বলে সারফেস ওয়েব বা ভিসিবেল ওয়েব বা ইনডেক্স ওয়েব বা লাইট নেট। ২০১৫ সালের ১৫ জুন গুগলের দেওয়া একটি রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, গুগল ১৪.৫ বিলিয়ন ওয়েব পেজ সারফেস ওয়েবে ইনডেক্স করেছে। এবং আপনি হয়তো শুনলে অবাক হবেন, হাতের সামনে আপনাকে যুগিয়ে চলা বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিনের তথ্য আপনাকে প্রতিনিয়ত শিক্ষিত করে চললেও তার পরিমাণ মাত্র ১০ শতাংশ, অবাক লাগলেও একদম সত্যি।

ডিপ ওয়েব কী? ডিপ ওয়েব হল একপ্রকার ইন্টারনেট ব্যবস্থা, যা অ্যাক্সেস করার জন্য আপনাকে নির্দিষ্ট সার্ভারকেই ব্যবহার করতে হবে। না হলে কোনও তথ্যই আপনি পাবেন না। সাধারণত যে কোনও দেশের গোয়েন্দা সংস্থা, বড় বড় কোম্পানি, সরকার, আর্মি এই ধরনের ওয়েব ব্যবহার করে নিজেদের গোপনীয় তথ্যকে সুরক্ষিত রাখতে। হয়তো এতদূর পড়ে ডিপ ওয়েবকে ভাল লাগলেও এই ওয়েব ব্যবস্থাকে অনেকে কটাক্ষ করে ‘মাফিয়াদের স্বর্গরাজ্য’ও বলেন। অনুমান করা হয়, ইউএস ন্যাভাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি ১৯৯০ সালে প্রথম ডিপ ওয়েব ব্যবহার করা শুরু করেছিল। আর তার ঠিক ২৮ বছর পরে, মানে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১.৫ ট্রিলিয়ন ইউএস ডলারের বেআইনি ব্যবসা হয়েছে ডিপ ওয়েবের মাধ্যমে। অনুমান করা হয়, ৭৫০০ টেরাবাইটেরও অধিক তথ্য এই ডিপ ওয়েবে স্টোর করা আছে। আপনি শুনলে হয়ত অবাক হবেন, আপনার প্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া সাইট ফেসবুকেরও ডিপ ওয়েব সাইট রয়েছে। কারণ যে সব দেশে ফেসবুক ব্যবহার নিষিদ্ধ, সেই সমস্ত দেশ থেকে টর-এর মতো ব্রাউসার ব্যবহার করে সহজেই যাতে ফেসবুক ব্যবহার করা যায়। কিন্তু সাবধান, এই ধরনের ব্রাউসার ব্যবহার করার আগে ১০০ বার ভেবে তার পরেই এগোবেন। কারণ আপনার ব্যক্তিগত তথ্য হ্যাকারদের হাতে খুব সহজেই চলে যেতে পারে এর মাধ্যমে। অনুমান করা হয়, ৮৪ শতাংশ ইনফরমেশন এই ডিপ ওয়েবে স্টোর করা আছে।

dark webরইল বাকি ডার্ক ওয়েব। এই ওয়েবে যা তথ্য থাকে, তা কোনও সার্চ ইঞ্জিন ইনডেক্স করতে পারে না, তাই সহজে ডার্ক ওয়েব অ্যাক্সেস করা যায় না। মূলত এখানে সমস্ত তথ্য এনক্রাইপ্ট অবস্থায় থাকে, এই পৃথিবীর মাত্র ৬ শতাংশ তথ্য এই ডার্ক ওয়েব বা ডার্ক নেটে আছে। বিশেষ কিছু ব্রাউসার ছাড়া ডার্ক ওয়েবে প্রবেশ বালির মধ্যে পোস্তর দানা খোঁজার মতোই কঠিন কাজ। মূলত এই ওয়েব ড্রাগসের ব্যবসা, স্মাগলিং ও চুরি করা ব্যক্তিগত তথ্য (ব্যাংক অ্যাকাউন্ট) কেনা-বেচা করার সুপার মার্কেট। অ্যামাজন, ফ্লিপকার্ট-এর মত কেনা-বেচা করার ওয়েব সাইট ডার্ক ওয়েবেও আছে এবং জিনিস কেনার পর রেটিং দেওয়ারও ব্যবস্থা সেখানে আছে। ২০১২ সাল পর্যন্ত ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে ১৭ মিলিয়ন ইউএস ডলারের ব্যবসা হলেও ২০১৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮০ মিলিয়ন ইউএস ডলার। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন হচ্ছে, তিন বছরের মধ্যে প্রায় ১০ গুণ ব্যবসাবৃদ্ধি ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে হচ্ছে কীভাবে? উত্তর একটাই, ‘রেড কর্নার’ বা ‘রেড রুমের’ জন্য।

red cornerকী এই রেড কর্নার? আপনি হয়তো বলিউডের ‘লাক’ বা ‘টেবল ২১’ সিনেমাটি দেখেছেন, সেটাই ডার্ক ওয়েবের রেড কর্নার। কী হল, বুঝতে পারলেন না তো? তা হলে আসুন সহজ ভাষায় বোঝার চেষ্টা করি, লাইভ বেটিংয়ের মাধ্যমে খুন বা রেপ করা এই রেড রুমের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। শুনতে অবাক লাগলেও এটাই সত্যি। এখানে কোটি কোটি টাকার বেটিং লাগানো হয়, অসহ্য যন্ত্রণা দিয়ে কাউকে রেপ বা খুন করার জন্য বা দেহের কোনও অংশ কেটে বাদ দেওয়ার জন্য। সাধারণত বিকৃত মানসিকতার বিলিয়নিয়াররা রেড রুমের কাস্টমার। অনুমান করা হয়, ২০০০ সালে জাপানে রেড রুম অ্যানিমেশনের মাধ্যমে প্রথম প্রকাশ্যে আসে।
যত দিন যাচ্ছে, আমরা বিজ্ঞানের বলে বলিয়ান হয়ে উঠছি, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রতিটা জিনিসের যেমন ভাল দিক আছে, তেমনই খারাপ দিকও আছে। তাই প্রযুক্তির অপব্যবহার আর সময়ের অভাবে মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। তাই হয়তো ফুলেফেঁপে উঠছে মানুষ মারার ব্যবসা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here