ginsberg

বাসব রায়: গত রাতে, আড়াইটা বা তিনটে, কাজ শেষ করে ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছি, কয়েকটা বড় গাড়ি এসে থামল, কাছেই। আর তারপর ভারি বুটের শব্দ আর পরিত্রাহী চিৎকার। পুলিশ-আর্মিতে ছয়লাপ আমাদের পাশেই জ্ঞানদীপ স্কুলের আশপাশ। শনে ছাওয়া ঘর, বেড়ার পলকা দরজা, লাথ মারলেই ভেঙে পড়ছে, খুলে যাচ্ছে, ঢুকছে পুলিশ আর বেরিয়ে আসছে তিন-চার-পাঁচজনকে সঙ্গে নিয়ে। কোনও কথা নেই, বার্তা নেই, তর্ক নেই, আলোচনা নেই… ট্রাকে ওঠো, থানায় চলো। নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র দেখাতে হবে, নিশুত রাতে, থানায় গিয়ে।
দেখাতে না পারলে? ডিটেনশন ক্যাম্প। না, আমার কাছে উপরিউক্ত ঘটনার কোনও ছবি-প্রমাণ নেই, কিন্তু ঘটনাটা সত্যি। যেমন সত্যি, অসমের সীমান্ত এলাকায় কোনও কোনও স্থানে গত কয়েকদিনে অনেকেই বিদেশি নোটিশ পেয়েছেন, কিংবা নিম্ন অসমের একটি থানায় বিদেশি-সন্দেহভাজন এক নারীর ওপর অমানুষিক অত্যাচারে তাঁর গর্ভপাত হয়েছে। হ্যাঁ, এরকম ঘটছে, মনগড়া কথা নয়, খবরেই প্রকাশ, এসব।

এনআরসি, ১৯ লক্ষ নামছুট, ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল, সুপ্রিম কোর্ট, বিজেপি-আসু-কংগ্রেস, সবই আছে, থাকবেও শুধু নিরাপদ ঠাঁই থাকবে না তাঁদের, যাঁরা এরপরও কাট-অব-ডেটের আগের নথি দেখাতে পারবেন না। ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি হচ্ছে, জানি, আরও হবে, সেটাও জানি। কিন্তু শেষপর্যন্ত অনাগরিকদের সবার সেখানে স্থান সংকুলান হবে না, এবং রাষ্ট্র এখনও স্থির করতে পারেনি, তাঁদের নিয়ে কী করা হবে।
কোথায় যাবেন তাঁরা? শরণার্থী শিবিরে? উদ্বাস্তু শিবিরে? ১৯৭১ সালের যশোর রোডের দু’ধারের সেই শিবিরের মতো নতুন করে কি আমরা দেখব অসম-বাংলা পথে আরও আরও ক্যাম্প? নামহীন শিবির?
আর কবি কী লেখেন ওই শিবিরে গিয়ে…
Millions of babies watching the skies
Bellies swollen, with big round eyes
On Jessore Road -long bamboo huts
No place to shit but sand channel ruts
কৃমিতে পেট-ফোলা লক্ষ লক্ষ শিশু আকাশ দেখছে সেখানে, বড় বড় চোখ করে, সারি দিয়ে রয়েছে বেড়ার ঘর, লুকোনোর প্রায় কিছুই নেই।
Millions of fathers in rain
Millions of mothers in pain
Millions of brothers in woe
Millions of sisters nowhere to go
বৃষ্টি পড়ছে, ভিজছে বাবারা, যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে মায়েরা, ব্যথায় কাতর ভাইয়েরা আর যা চিরকালীন, বোনেদের কোথাও যাওয়ার নেই।

আজ যখন এনআরসি অভিঘাতে ১৯ লক্ষ নামহীন, অনাগরিক হওয়ার শঙ্কায় ভুগছে। যখন প্রতিবেশী রাজ্যগুলিতে এনআরসি-আতঙ্ক ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছে, যখন কবি-লেখক-গায়ক-অভিনেতা-বুদ্ধিজীবীদের গর্জে ওঠার সময়, অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক সত্য যে, এখন এঁদের মধ্যে প্রায় অধিকাংশই আশ্চর্য চুপ। যেন এনআরসি বলে কিছু নেই, ১৯ লক্ষ নামহীনের ঘটনা ঘটেনি। অনাগরিক হিব্রু শব্দ! তাঁরা এর অর্থ জানেন না!
অথচ ১৯৭১-এ যশোর রোডে গিয়ে, আপাত-নজরে উদ্বাস্তু শিবির দেখে, সুনীল-শক্তি-সন্দীপনের সঙ্গে সাহিত্যের অন্যান্য বিষয়ে তর্ক-গল্প-আলোচনা করতে করতে ফিরেছিলেন এক বিদেশি। হ্যাঁ, যে দেশ সাম্রাজ্যবাদের চূড়ান্ত কণ্ঠস্বর, সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা, এক বিদেশি। লোকটা কবি।
One Million aunts are dying for bread
One Million uncles lamenting the dead
Grandfather millions homeless and sad
Grandmother millions silently mad
মা-বাবা-সন্তানই শুধু নয়, উদ্বাস্তু শিবির তো ঠাকুমা-ঠাকুরদা-কাকা-কাকিমারও। আর সেখানে সব-হারানোর বেদনা ছাড়া আর কীই-বা থাকে!
Millions of daughters walk in the mud
Millions of children wash in the flood
A Million girls vomit & groan
Millions of families hopeless alone
মা কাঁদছে ‘মাইয়া’র হাত ধরে। গরিব তাই অপুষ্ট পা, যেমন থাকে বৃদ্ধ সন্ন্যাসিনীর।
Mother squats weeping and points to her sons
Standing thin legged like elderly nuns
Small bodied hands to their mouths in prayer
Five months small food since they settled there

On one floor mat with small empty pot
Father lifts up his hands at their lot
Tears come to their mother’s eye
Pain makes mother ‘Maiya’ cry’
এবং এর পর কবি প্রশ্ন করেন, যা আজ আমাদের অনেকেরই প্রশ্ন…
Where are our tears? Who weeps for the pain?
Where can these families go in the rain?
Jessore Road’s children close their big eyes
Where will we sleep when our father dies?

হ্যাঁ, নামহীনদের জন্য আমাদের অশ্রু কোথায়? কে কাঁদছে তাঁদের যন্ত্রণায়? এই নামহীনরা কোথায় যাবেন? আমাদের পিতারা, সহ-নাগরিকরা উদ্বাস্তু শিবিরে গেলে, আমরা কীভাবে ঘুমোই?
(বলতে হয় না, সবাই জানেন, তবু রেকর্ডের জন্য উল্লেখ্য যে, অ্যালেন গিনসবার্গের কবিতাংশ রয়েছে এখানে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here