kolkata news

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: মহিলা সাংবাদিককে ফেসবুকে আপত্তিকর ও অশালীন মন্তব্য করার অভিযোগে বাংলার ইউটিউবার কিরণ দত্তের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই মামলা রুজু করেছে কলকাতা পুলিশ। সব তথ্য প্রমাণ খতিয়ে দেখে তবেই এই অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে গড়ফা থানার পুলিশ। বৃহস্পতিবার এই নিয়েই দিনভর সরগরম ছিল সোশ্যাল মিডিয়া। কিন্তু ঠিক কি কারণে থানায় অভিযোগ দায়ের করা হল কিরণের বিরুদ্ধে? এমন কি বা করেছিলেন তিনি যার জন্য ভারতীয় দণ্ডবিধির ৫০৯ নং ধারায় এই ইউটিউবারের বিরুদ্ধে পুলিশ এফআইআর দায়ের করল? বৃহস্পতিবার এই নিয়েই একগুচ্ছ বিভ্রান্তিও জারি রইল ফেসবুক জুড়ে।

ঘটনার সূত্রপাত, গত রবিবার রাতে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনবরত ট্রোল বা ব্যাঙ্গের শিকার হতে থাকা মৃদুল দেব নামে ষাটোর্ধ এক হতদরিদ্র মানুষের দুর্দশার খবর প্রথম সম্প্রচার করা হয় মহানগর ২৪×৭-এ। প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হতেই তা লক্ষাধিক মানুষের হৃদয় স্পর্শ করে যায়। সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে প্রতিবেদনটি নিমিষেই ছড়িয়ে পড়ে গোটা বিশ্বে। ট্রোলের আড়ালে থাকা অসহায় মানুষটির করুণ অবস্থা দেখে দেশ বিদেশের অসংখ্য মানুষ মহানগরের দপ্তরে যোগাযোগ করেন মৃদুল বাবুকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে চেয়ে। যদিও আশ্চর্যজনকভাবে সম্পূর্ণ উল্টো পথে হেঁটে, এই খবরটির জন্য সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককেই আপত্তিকর ভাষায় তীব্র শ্লেষের সঙ্গে আক্রমণ শুরু করেন কিরণ দত্ত। খবরটি প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মহানগরের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে ঢুকে ওই খবরটির কমেন্ট বক্সে নিজের ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে আপত্তিকর মন্তব্যটি করেন কিরণ দত্ত। যদিও পরদিন তা নিজেই মুছে দেন।

ক্রমশ ট্রোল হতে থাকা মৃদুল বাবুর চরম দুর্দশার ও হেনস্থার অভিযোগ সংক্রান্ত খবরটি তুলে ধরেন সাংবাদিক রাজেশ সাহা। যদিও ওই প্রতিবেদনে কণ্ঠস্বর দেওয়া এক মহিলা সংবাদকর্মীকে সংশ্লিষ্ট খবরের রিপোর্টার মনে করে আচমকাই তাঁকে ব্যক্তিগত আক্রমণ শুরু করেন কিরণ। মহিলা সাংবাদিককে ‘ফুটেজখোর‘, ‘জঘন্য রিপোর্টার‘ বলে আক্রমণ শানান তিনি। শুধু তাই নয়, কোনও এক অজ্ঞাত কারণে নিজের ক্ষোভ উগরে দিতে, ওই মহিলা সাংবাদিককে টলিউড অভিনেতা অঙ্কুশকে ‘তেল মারা মহিলা‘ বলেও কটাক্ষ করেন ইউটিউবার কিরণ দত্ত। এরপরেই প্রতিবেদনে কণ্ঠস্বর দেওয়া ওই মহিলা সাংবাদিককে কড়া আক্রমণ করতে একটি অশালীন শব্দেরও প্রয়োগ করেন কিরণ। তিনি মন্তব্য করেন, “এ নিজের ভিউজ বাড়ানোর জন্য আলবা# বলে গেলো“। (তাঁর ব্যবহৃত শব্দটি অশালীন হওয়ায় তা প্রতিবেদনে প্রকাশের অযোগ্য) পাশাপাশি কিরণ ওই মহিলা সাংবাদিককে কটাক্ষ করে আরও লেখেন, তিনি নাকি সব লেভেলের মানুষকে ‘টন্ট মেরে‘ বেড়ান। জনপ্রিয় ইউটিউবারের থেকে অকারণে তাঁকে উদ্দেশ্য করে এমন ভাষা প্রয়োগ দেখে চরম হতাশ হয়ে যান ওই মহিলা সাংবাদিক নিজে। তিনি বলেন, “কিরণ দত্তকে আমি ব্যক্তিগত ভাবে চিনি না। আমাকে কি কারণে কোন প্রমাণ ছাড়াই আচমকা এতোগুলা কটাক্ষ করা হল এখনও বুঝতে পারছি না, এমন জনপ্রিয় ইউটিউবারের কাছ থেকে সম্পূর্ণ অকারণে এমন ব্যবহার ভীষণ অপ্রত্যাশিত।” তিনি আরও বলেন, “কিরণের মন্তব্য দেখে ফেসবুকে আরও অনেকেই তাঁকে সমর্থন করে কমেন্ট করে আমাদের ভুরিভুরি আক্রমণ করতে থাকেন। সেগুলি দেখেই মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ি”।

এখানেই ক্ষান্ত থাকেননি ইউটিউবার কিরণ দত্ত। ফের আরও একটি কমেন্ট করে তিনি লেখেন, মৃদুল বাবুর খবরটি নাকি নিজেদের ভিউজ বাড়াতেই তাঁকে শিখিয়ে পড়িয়ে নিয়ে মানুষের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। অসহায়তার সুযোগ নিয়ে তাঁকে যেমন ইচ্ছে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন কিরণ। তাঁর এই অভিযোগ শুনেই হতবাক হয়ে গিয়েছেন খোদ মৃদুল বাবু নিজেও। মহানগরের ক্যামেরার সামনেই তিনি এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন,”আপনারা তো আমার উপকারই করলেন, শিখিয়ে পড়িয়ে দিতে যাবেন কেন!” যদিও সোশ্যাল মিডিয়ায় এই যুবক জনপ্রিয় হওয়ার সুবাদে নিমেষেই তাঁর মন্তব্যগুলি দৃষ্টি আকর্ষণ করে লক্ষাধিক মানুষের। তাঁর মন্তব্যে প্রভাবিত হয়ে অসংখ্য মানুষ আক্রমণ শুরু করেন গোটা সংবাদ মাধ্যম সহ সাংবাদিকদের। তাঁর ওই উস্কানীমূলক মন্তব্য গুলিতে প্রভাবিত হয়ে আক্রমণ করা ব্যক্তিদের মধ্যে পঞ্চানন পোদ্দার নামে এক যুবক সরাসরি লেখেন, “আমার মনে হয় না মহানগর ২৪×৭ মৃদুল বাবুকে কিছু সাহায্য করেছে!” কিরণের সুরে সুর মিলিয়ে তিনিও বলেন মৃদুল বাবুর গরিবিয়ানাকে পোট্রে করে নাকি রোজগার করছে সংবাদমাধ্যম। এই ধরনের একাধিক কুরুচিকর আক্রমণ ক্রমেই ধেয়ে আসতে থাকে কিরণের মন্তব্যের পর থেকেই।

এরপরই বাধ্য হয়ে থানায় কিরণ দত্তের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করে মহানগর ২৪×৭ কর্তৃপক্ষ। তথ্য প্রমাণ হিসেবে পুলিশের কাছে জমা দেওয়া হয় তাঁর কমেন্টের স্ক্রিনশটের প্রিন্ট আউটও। মহানগরের সম্পাদক তথা কর্ণধার ধৃতাংশু দাঁ বলেন, “যে কোনো বিষয়ে কোনও পাঠক বা দর্শকের প্রশ্ন বা সমালোচনা থাকতেই পারে,এটাই স্বাভাবিক। গঠনমূলক সমালোচনাকে সব সময় স্বাগত জানাই। কিন্তু আমাদের যে মহিলা সাংবাদিক খবরটাই করেনি, তাঁকে হঠাৎ এমন কুরুচিপূর্ণ ভাষায় ব্যক্তিগত আক্রমণ কেন?” তিনি আরও বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়ায় ওই ইউটিউবারের জনপ্রিয়তা থাকায় সকলেই তাঁর মন্তব্যে প্রভাবিত হয়ে আমাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে! এটা তো একটা প্রতিষ্ঠানের পক্ষেও বিপজ্জনক! কোনো প্রমাণ ছাড়াই আচমকা এই ধরনের অভিযোগে প্রতিষ্ঠান ও সাংবাদিকের সম্মানহানি হয়েছে, মাথায় রাখতে হবে আমি প্রভাবশালী হলে আমাকে ভেবেচিন্তে মন্তব্য করা উচিত।” কিরণের এই কাজে হতবাক অনেকেই। নেটিজেনদের একাংশের প্রশ্ন, “যেই বিষয়ের সাথে বং গাইয়ের কোনও সম্পর্কই নেই, হঠাৎ করে খামোখা তার মধ্যে ঢুকে এতো গুলো মন্তব্যই বা করতে কেনো গেল সে”? তাহলে কি সস্তা জনপ্রিয়তা নাকি অন্য কোনও অবসাদ? প্রশ্ন থাকছেই।

মঙ্গলবার গড়ফা থানায় এই বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করা হয়। এরপর মহানগরের তরফে জমা দেওয়া তথ্য প্রমাণ খতিয়ে দেখেই বুধবার এফআইআর দায়ের করে পুলিশ। পুলিশ সূত্রে খবর, আপাতত ভারতীয় দণ্ডবিধির ৫০৯ নং ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে বং গাই কিরণ দত্তের বিরুদ্ধে। অভিযোগ ও তথ্য প্রমাণ খতিয়ে দেখে ভবিষ্যতে তথ্য প্রযুক্তি আইনের বিভিন্ন ধারাও যোগ করা হতে পারে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। বৃহস্পতিবারই এই অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে গড়ফা থানার পুলিশ। খুব শীঘ্রই অভিযুক্ত কিরণ দত্তের কাছে হাজির হতে নির্দেশ দিয়ে নোটিশ পাঠানো হবে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। মহানগরের সম্পাদক জানিয়েছেন, প্রমাণ ছাড়াই মিথ্যে ও আপত্তিকর মন্তব্য করে প্রতিষ্ঠানের সম্মানহানি করার অভিযোগে আদালত খুললেই একটি মানহানির মামলাও করা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here