kolkata news

 

সিরাজুল ইসলাম

কয়েকদিন আগে লকডাউন বিধি কার্যকর করতে যাওয়া এক পুলিশ অফিসারের হাত কেটে নেওয়া হয়েছিল পঞ্জাবে। কী ‘অপরাধ’ ছিল ওই পুলিশ অফিসারের?  করোনাকে হারাতে মানুষ যাতে ঘরে থাকে, সেটাই নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন ওই পুলিশ অফিসার। বিনিময়ে কী পেলেন তিনি? না পুরস্কারস্বরূপ মনে রাখার মতো কিছু পাননি তিনি। বরং, এমন ‘পুরস্কার’ তিনি পেয়েছিলেন, যার কথা ভেবে তিনি সারাজীবন শিউরে উঠবেন।

এবার এই রাজ্যের হাওড়া। লকডাউন বিধি কার্যকর করতে গিয়ে জনতার রোষের মুখে পড়তে হল পুলিশকে। এমন হামলার মুখে পুলিশকর্মীদের মৃত্যুও হতে পারত। পুলিশকে লক্ষ্য করে আধলা ইট, বড় বড় পাথর ছোড়া হল। নিজেদের বাঁচাতে পুলিশ পিছু না হটলে হয়তো মারাও যেতে পারতেন কেউ কেউ। এখানে পুলিশের ‘অপরাধ’ কী? পুলিশ চেয়েছিল, মানুষ ঘরে থাকুক। তা হলে পরাস্ত হবে করোনা। ভাল থাকবে মানুষ। বেঁচে যাবে এই সমাজ। আর সেই কারণেই হাওড়ার বেলিলিয়াস রোডের টিকিয়াপাড়া ফাঁড়ির কাছে বহু মানুষের ভিড় জমেছে জানতে পেরে পুলিশ সেখানে হাজির হয়। মানুষকে অনুরোধ করে ভিড় না করার জন্য। ভিডিয়ো-তে দেখা গিয়েছে, অত্যন্ত নরম ভাবে পুলিশ জনগণকে সেখান থেকে চলে যেতে বলছে। তারপরও লোকজন তো সেখান থেকে সরেইনি, উল্টে আরও বহু মানুষের ভিড় জমে যায়। পুলিশের হাতে লাঠি ছিল। পুলিশ চাইলে বেপরোয়া লাঠিচার্জ করে কয়েক মিনিটের মধ্যে ছত্রভঙ্গ করে দিতে পারত ওই ভিড়। কিন্তু তা করেনি পুলিশ। কেন করেনি? এই প্রশ্ন উঠবে। অনেক কারণের কথা হয়তো উঠে আসবে। তবে আসল কারণ হল সংযম দেখিয়েছে পুলিশ। কাদের ওপর সংযম দেখিয়েছে পুলিশ? যে মানুষগুলো পুলিশের ওপর বড় বড় ইট-পাথর ছুড়েছে, পিঠে লাথি মেরেছে- সেই মানুষগুলির ওপর। কারণ, ওই মানুষগুলি প্রত্যেকেই রোজা করছিল।

চলছে রমজান। আর এই রমজান মাসে যে রোজা অর্থাৎ সিয়াম চলছে, তার অর্থ হল সংযম। আর সেই সংযমের চূড়ান্ত নিদর্শন টিকিয়াপাড়ায় দেখাল পুলিশ। অথচ, যারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাথর ছুড়ল, সেই লোকগুলো যে রোজা অর্থাৎ সিয়াম পালন করছে তাদেরই তো দেখানোর কথা সংযম। কারণ, গোটা মাস-ই তাদের এই সংযমের মধ্যে দিয়ে চলতে হবে। কিন্তু কী দেখাল তারা? না সংযম তারা দেখায়নি। উল্টে রমজান মাসে উন্মত্ত হয়ে উঠল তারা। যা এই রমজান মাসে চলতে থাকা রোজার একেবারেই পরিপন্থী।

বেপরোয়া লাঠিচার্জ করে পুলিশ কেন জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দিল না? এই প্রশ্ন অনেকেই তুলবেন। সঙ্গত প্রশ্ন। চাইলেই কয়েক মিনিটে পুলিশ তা করতে পারত। কিন্তু, কাদের ওপর লাঠি চালাত পুলিশ? তারা তো সবাই রোজাদার। তাই মাথায় ইট-পাথরবৃষ্টি সহ্য করে, পিঠে লাথি খেয়ে পুলিশ সেখান থেকে সরে আসে। সংযমের চূড়ান্ত নিদর্শন এদিন পুলিশই দেখাল। সেখানে হাজির সিয়াম পালন করা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উন্মত্ত জনগণ সেই সংযম দেখাতে পারেনি। এমন নয় যে পুলিশ টিকিয়াপাড়া গিয়ে মানুষের ধর্মের ওপর হস্তক্ষেপ করেছে। পুলিশ শুধু মানুষকে বলে ভিড় না করতে। গোটা রাজ্য জুড়ে সব জায়গায় পুলিশ এখন এমনটাই করছে। এদিন টিকিয়াপাড়াতেও তাই করে পুলিশ। কিন্তু তার বিনিময়ে পুলিশের ওপর করা হল ইটবৃষ্টি, মারা হল লাথি।

কোনও রাজনৈতিক ইস্যু নয় যে, পুলিশের ভূমিকায় কোনও পক্ষপাতিত্ব থাকবে। করোনাকে হারানোর এই যে প্রয়াস চলছে তা সম্পূর্ণ সামাজিক। এখানে পুলিশ কোনও পক্ষের হয়ে কাজ করছে না। পুলিশের একটাই চাওয়া, মানুষ ঘরে থাকুক। যথাযথ পালিত হোক লকডাউন। তা হলেই হারবে করোনা। আর সেই চাওয়া থেকে পুলিশ ২৪ ঘণ্টা পথেই অতিবাহিত করছে। এই সময় পুলিশ ভুলে গিয়েছে নিজের ঘর-সংসার, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-স্বজনের কথা। কেউ খেতে পারছে না, জানতে পেরে তার বাড়িতে পুলিশ পৌঁছে দিচ্ছে ত্রাণ। ঘরবন্দি অবস্থায় কেউ পাচ্ছেন না ওষুধ, তাও পৌঁছে দিচ্ছে পুলিশ। লকডাউনের কারণে ব্লাডব্যাঙ্ক এখন রক্তশূন্য, সেই ঘাটতি মেটাতে রক্তদান করছে পুলিশ। করোনায় মৃত্যু হওয়া কারও দাহ করতে পাওয়া যাচ্ছে না লোক, সেখানেও আছে পুলিশ। হাসপাতাল থেকে পালানো করোনা আক্রান্তকে খুঁজে আনার দায়িত্বও পুলিশের। এই সময় জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ- সবই করতে হচ্ছে পুলিশকে। আবার সেই পুলিশকেই মাথায় পেতে নিতে হচ্ছে বড় বড় ইট-পাথর। পিঠে খেতে হচ্ছে দমাদ্দম লাথি। কেন পুলিশ এটা সহ্য করবে?

সমাজকে ভাল রাখার যে প্রয়াস পুলিশ চালাচ্ছে, তাতে আমাদের সবার উচিত পুলিশকে পূর্ণ সমর্থন করা। বেয়াড়াপনা দেখলেই পুলিশ যেন আর রেয়াত না করে। পুলিশ যেন এখন না দেখে কার কী ধর্ম, কার কী রাজনৈতিক পরিচয়। রমজানের দোহাই দিয়ে যেন ছাড় না দেওয়া হয়। নিয়ম সকলের জন্য সমান। লকডাউনের কারণে যেন বাড়তি সুবিধা না দেওয়া হয় কাউকে। কারণ, তাতে লকডাউনের প্রকৃত অর্থ লঙ্ঘিত হবে। তারপরও যদি কেউ আইন ভাঙে, তখন পুলিশ দেখিয়ে দিক তারা কী পারে। হলফ করে বলছি, স্বার্থান্বেষী দু-একজন ছাড়া কেউ পুলিশকে কাটগড়ায় তুলবে না। গোটা রাজ্যের মানুষ বাহবা দেবে পুলিশকে। এখন থেকে লকডাউনের বাকি দিনগুলোতে অন্তত পুলিশের ভূমিকা এমনটাই হোক। এটাই প্রত্যাশা করি পুলিশের কাছে।

মতামত লেখকের নিজস্ব…।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here