offbeat news

দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়

রাষ্ট্রসংঘ ২০০৬ সাল থেকে আজকের দিনটিকে বিশ্ব আনন্দ দিবস বলে ঘোষণা করেছে। পৃথিবীটা আমাদের সবাইকার। পৃথিবীর প্রত্যেক অনু-পরমাণুর সঙ্গে আমাদের আত্মীয়তা। আমরা প্রত্যেকে পৃথিবীর নাগরিক। আর সেই নাগরিকের স্বাধীন ভাবে, সুস্থ ভাবে, আনন্দ করে বাঁচার অধিকার আছে। পৃথিবীর কাছে প্রত্যেক দেশ, প্রত্যেক জাতি, ঋণী – কারণ এই গ্রহ আমাদের থাকতে দিচ্ছে, খাদ্য দিচ্ছে , আলো দিচ্ছে, জল দিচ্ছে, বায়ু দিচ্ছে। আজকের দিনটির দর্শন রবীন্দ্রনাথের গানের সেই পংক্তিটি- ‘আনন্দ ধারা বহিছে ভুবনে’ কিংবা সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর সেই লাইন ‘আহা! কী আনন্দ আকাশে বাতাসে।’

কিন্তু দুর্ভাগ্য হল আজ মানুষই মানুষের শত্রু। মানুষই মানুষকে ঠিক মতো বাঁচতে দিচ্ছে না। প্রাচীন রোম পুড়ছে দেখেও নিরো’র কোনও বিকার ছিল না। তিনি বাজিয়ে চলেছিলেন বীণা। আজ গোটা মানব জাতিই পরিণত হয়েছে সংবেদনহীন রোম সম্রাটে। ‘সভ্য’ মানুষ দু-দুটো বিশ্ব যুদ্ধ সংগঠিত করল। হিটলার লক্ষ লক্ষ ইহুদিকে গ্যাস চেম্বারে হত্যা করল। ভিয়েতনামের নাগরিকদের ওপর আমেরিকা প্রশাসন চালালো অকথ্য অত্যাচার, করল যুদ্ধ। মহাত্মা গান্ধী, মার্টিন লুথার কিংকে মানুষই হত্যা করল। কোথায় রইল আনন্দে স্বাধীন ভাবে আমাদের এই রাজার রাজত্বে বাঁচার অধিকার!

পৃথিবীতে তো কম ধর্মগুরু, ধর্মপ্রচারক, সমাজ সংস্কারক, রাজনৈতিক বোদ্ধা আসেননি। তাঁদের কথায়, কার্যধারায়, মানসিকতায় তাঁরা শুধু একটা কথাই বলেছেন, মানুষকে ভালবাসো, মানুষকে আনন্দে রাখ- সে মুসা, ইশা, শাক্য সিংহ যেই হোন না কেন।

বর্তমান পৃথিবী এক অদ্ভুত বাড়ির চৌকাঠে দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে না আছে আনন্দবোধ না আছে দুঃখবোধ, না আছে অন্য কিছু উগরে দেবার তৃতীয় কোনও স্তর। একটা ফুল দেখে আনন্দ হল, আমার সে আনন্দ শোনার মত লোক কই। সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের সময় দিগন্ত বিস্তৃত সৌন্দর্য পৃথিবীকে কতখানি আনন্দময় করে তোলে- সেটা ভাগ করে নেবার মত লোক নেই। মানুষ আনন্দ করতে ভুলে গেছে।

মনে পড়ছে দিব্যেন্দু পালিতের ছোটগল্প ‘ফ্ল্যাগ স্টেশন’, মৃণাল সেন এই ছোট গল্প থেকেই ছোট পর্দার জন্য ছবি করেছিলেন ‘আজনভি’ । স্টেশনে অচেনা অজানা এক যুবতীর সঙ্গে এক অচেনা অজানা যুবকের আলাপ। ট্রেন আসতে দেরি করছে। ওই ট্রেনে যুবকটি কলকাতা ফিরবে-আর যুবতীটির বাবা ওই স্টেশনে ট্রেন থামার সময়টুকুতে ট্রেনের কামরা থেকে তার মেয়ে জামাই-এর সঙ্গে দেখা করবে-কয়েক মুহূর্ত। এই ফাঁকে কথা বলতে বলতে তাদের আলাপ জমে উঠল। যুবতীটি যুবকটিকে বলছে, আমি আমার বাবা মায়ের অমতে বিয়ে করেছিলাম বাড়ি থেকে পালিয়ে। আজ আমার স্বামী আমাকে ছেড়ে পালিয়েছে। বাবা সে কথা জানে না। বাবা জানে আমি সুখে শান্তিতে, আনন্দে সংসার করছি। বাবা আজ প্রথম আমার স্বামীকে দেখবে। কিন্তু কোথায় পাব তাকে, আপনি একটু আমার স্বামীর হয়ে অভিনয় করে দেবেন। আপনি আমার নকল স্বামী হবেন। তারপর আপনি ট্রেনে করে চলে যাবেন বাবাও আপনাকে চিনবে না আর আপনিও বাবাকে চিনবেন না। বাবা যাতে ভাবে আমি শান্তিতে, সুখে, আনন্দে আছি। কী আকুল আবেদন মানুষ করছে আর একজন মানুষের কাছে অন্য একজন মানুষকে আনন্দে রাখার জন্য। এই তো পৃথিবী, এই ভাবে তৈরি করতে হবে আনন্দে থাকা, আনন্দে কথা বলা ও আনন্দের ছন্দ।

এবার ঘুরে দাঁড়াবার সময় এসেছে।
মানুষ মানুষকে চিনুক, মানুষ মানুষের জন্য সুস্থ
চিন্তা করুক, মানুষ মানুষকে আনন্দে রাখুক।

আমরা শপথ নিই,

‘সংসার মাঝে কয়েকটি সুর
রেখে দিয়ে যাব করিয়া মধুর,
দু একটি কাঁটা করি দিব দূর
তারপর ছুটি নিব।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here