kolkata bengali news

শ্যামলেশ ঘোষ: এক মচ্ছর আদমি কো…। মনে আছে, ‘যশবন্ত’ সিনেমার সেই জনপ্রিয় সংলাপ? নানা পাটেকরের সংলাপের পরবর্তী অংশটুকু আপত্তিকর মনে করি বলে লিখছি না। কেবল একটা ক্ষুদ্র পতঙ্গের সামনে মানুষের অসহায়তার কথা তুলে ধরতেই সেই সংলাপ মনে করানো। মনে করানো, আজ ২০ আগস্ট বিশ্ব মশক দিবস। মনে করানো, পৃথিবীতে আসার সময় থেকে অদ্যাবধি জন্মানো আনুমানিক ১০৮০০০০০০০০০০ (দশহাজার আটশো কোটি) মানুষের মধ্যে অর্ধেকের মৃত্যুই হয়েছে মশার কামড়ে। মানে, সংখ্যাটা ৫৪০০ কোটি। না ভুল পড়ছেন না। পাঁচ হাজার চারশো কোটি মানুষ মারা গিয়েছে মশার দংশনে। মনে করানো, এই মশারা বছরে অন্তত ৭০০০০০ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। ধর্মবিস্তার আর দখলের রাজনীতির স্বার্থে সংঘটিত যুদ্ধও যেমন বিশ্বে কোটি কোটি মানুষের মৃত্যু ডেকে এনেছে। মানুষকে লোপাট করতে অবশ্য মশার কোনও মারণাস্ত্রের প্রয়োজন পড়েনি। তার মারাত্মক হুলই তার জন্য যথেষ্ট।

বর্তমান বিশ্বে মশা এবং মানুষের সংঘাত তীব্র হয়ে উঠেছে। পৃথিবীর দুই প্রজাতির প্রাণী অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধে মানুষের জিতে যাওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল। কারণ সচেতনতা এবং সতর্কতা। আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার মতো মহাদেশের গ্রীষ্মপ্রধান দেশে এই সচেতনতা এবং সতর্কতার প্রয়োজনীয়তাও বেশি। মশার বিরুদ্ধে মানুষের কৌশলী লড়াইটাও শতাব্দপ্রাচীন। সাম্প্রতিক দশকে মশার কামড়ে মৃত্যুর পরিসংখ্যানে লাগাম পরানো সম্ভব হয়েছে। ম্যালেরিয়ার কথাই ধরা যাক। ১৯৯৫ থেকে ২০০৫, এই কুড়ি বছরে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা ৩০ কোটি থেকে কমে ২১ কোটিতে নেমেছে। ম্যালেরিয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা ৩০ লক্ষ থেকে কমে হয়েছে ৪.২ লক্ষ। ২০১৫-তে ভারতে মশাবাহিত রোগের শিকার হয়ে মারা গিয়েছেন ২৪০০০ মানুষ। উন্নত নিকাশি, চিকিৎসা এবং সচেতনতা এই মৃত্যুহ্রাসের কারণ। যদিও মশাযুদ্ধে বিজয় এখনও অনেক দূরে। তাতেই প্রশ্ন ওঠে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভাবনীয় ‘উন্নতি’ সত্ত্বেও পোলিও বা স্মলপক্স-এর মতো মশাবাহিত অসুখ নিয়ন্ত্রণে বা নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে না কেন?

মশার বিপদের বিরুদ্ধে লড়াইটা জারি আছে। মশারা ছড়ায় এমন অসুখে মৃত্যুরোধের দু’টি উপায় আছে। হয় মানবশরীরে মশাবাহিত অসুখের প্রতিরোধক্ষমতা বাড়িয়ে তুলতে হবে, নতুবা মশাকে নির্বংশ করতে হবে, অন্ততপক্ষে এডিস, কিউলেক্স ও অ্যানোফিলিস প্রভৃতি মশা, যারা প্রাণঘাতী জীবাণু বহন করে এমন মশাদের ধ্বংস করতে হবে। বিজ্ঞানীদের সাধ্যমতো চেষ্টা সত্ত্বেও বলা যেতে পারে, এটা কার্যত অসম্ভব। প্রথমত, শতেক বছর ধরে বিজ্ঞানীরা ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছেন, যেটা স্মলপক্স ভ্যাকসিনের মতোই চূড়ান্ত কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হতে পারে। তুলনায় ‘রোগের রাজা’ (কিং অব ডিজিজ) ম্যালেরিয়ার জন্য তৈরি টিকাটি ৩৯ শতাংশ কার্যকর। ডেঙ্গি, জাপানি এনেসেফেলাইটিস, ম্যালেরিয়া, জিকা, পীতজ্বরের (ইয়েলো ফিভার) মতো মারাত্মক রোগও মশার কামড়ে হয়। ফলে একটিমাত্র ভ্যাকসিন বানিয়ে এতগুলি মশাবাহিত অসুখ তাড়ানো ‘নেক্সট টু ইমপসিবল’।

বাকি থাকে, মশাদের সমূলে বিনাশ করার বিষয়। যেহেতু আক্ষরিক অর্থে, গোটা মশার প্রজাতিটি ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন, তাই জিন সম্পাদনা এবং অন্যান্য অভিনব পদ্ধতির মাধ্যমে ধীরে ধীরে এই ঘাতক পতঙ্গকে নির্মূল করার চেষ্টা চলছে। পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে মশাদের বেঁচে থাকার পরিসর ক্রমশ বেড়ে চলেছে। গবেষণা বলছে, সাধারণ কীটনাশকের বিরুদ্ধে মশাদের জিনগত প্রতিরোধক্ষমতাও (জেনেটিক রেসিস্ট্যান্স) বৃদ্ধি পেয়েছে। এখনও পর্যন্ত বিশ্বে প্রায় ৩৫০০ প্রজাতির মশা চিহ্নিত করা গিয়েছে। শুধু ভারতেই ৪০০-র বেশি মশা পাওয়া যায় এবং এদের প্রায় প্রত্যেকেই কোনও না কোনও অসুখের জীবাণু বহন করে থাকে। এই বিবিধ মশাদের কখনওই আলাদা করে গণনা সম্ভব নয়, কারণ মশারা নিজেদের কপি বাড়াতে ওস্তাদ। একটি স্ত্রী মশা স্থির জলে একসঙ্গে ১০০ থেকে ৩০০টি ডিম পাড়ে এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ডিম ফুটে যায়। লার্ভা থেকে পূর্ণবয়স্ক হয় দু’সপ্তাহের মধ্যে। আর দু’মাসের জীবৎকালে একটি স্ত্রী মশা অন্তত ১০ বার ডিম পাড়তে সক্ষম। তবে বুঝুন, প্রাকৃতিকভাবে মশানিধনকারী ব্যাঙ, মাকড়সা, টিকটিকি, ফড়িং, বিবিধ ছোটমাছ এবং ফিঙে প্রভৃতি পাখিদের বাস্তুচ্যুত করে আমরা কীভাবে নিজেদের কবর নিজেরাই খুঁড়েছি।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here