নিজস্ব প্রতিবেদক: জল-সংকট ভয়াবহ চেহারা নিচ্ছে বিশ্বজুড়ে। এই সংকট মোকাবিলায় জরুরি নাগরিক সচেতনতা। সেই লক্ষে এবং বিশ্ব জল দিবসের কর্মসূচি পালনের অংশ হিসেবে মঙ্গলবার কলকাতার বেঙ্গল ন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির আয়োজনে বিশেষ সেমিনার অনুষ্ঠিত হল। সেন্ট্রাল গ্লাস অ্যান্ড সেরামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং আকাদেমি অব ওয়াটার টেকনোলজি অ্যান্ড এনভায়রন ম্যানেজমেন্ট, কলকাতার সহায়তায় এই সেমিনারের থিম ছিল ‘লিভিং নো ওয়ান বিহাইন্ড’। বেঙ্গল ন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির কার্যালয়ে আয়োজিত এই সেমিনারে বক্তা হিসেবে হাজির ছিলেন সেন্ট্রাল গ্লাস অ্যান্ড সেরামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং আকাদেমি অব ওয়াটার টেকনোলজি অ্যান্ড এনভায়রন ম্যানেজমেন্ট, কলকাতার ডিরেক্টর কে মুরলীধরণ, গুরুনানক ইন্সটিটিউট অব ফার্মাসিউটিকাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির বায়োটেকনোলজি বিভাগের প্রধান ড. স্বাতী নন্দী চক্রবর্তী, কলকাতা পুরনিগমের জল সরবরাহ বিভাগের প্রাক্তন ডিরেক্টর জেনারেল বি কে মাইতি, আকাদেমি অব ওয়াটার টেকনোলজি অ্যান্ডএনভায়রন ম্যানেজমেন্টের ডিরেক্টর ড. অসীমকুমার ভট্টাচার্য প্রমুখ।

আমরা জানি, পৃথিবীর চারভাগের তিনভাগ জল আর একভাগ স্থল। তবুও আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণ পরিস্রুত জলের জন্য ভাবতে হচ্ছে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুষ্ঠুভাবে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এবং জীবজগৎকে সুস্থ পরিবেশে টিকিয়ে রাখার জন্য। পৃথিবীর দুই-তৃতীয়াংশ জলের মধ্যে ব্যবহারযোগ্য জল অর্থাৎ পানীয়, কৃষিকাজ, গৃহস্থালি বা অন্যান্য কাজের জন্য কতটা জল লাগে ও লবণাক্ত জল কতটা তা জানাতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, মোট জলের শতকরা সাড়ে সাতানব্বই শতাংশ জল লবণাক্ত আর শতকরা মাত্র আড়াই ভাগ জল ব্যবহারযোগ্য। এই ব্যবহারযোগ্য জলের মধ্যে আবার সাড়ে চুয়াত্তর ভাগ জল রয়েছে বরফ আকারে ও তুষার শৃঙ্গে আটকে। আর শতকরা মাত্র ০.৩ ভাগ জল পাওয়া যায় নদীতে, জলাশয়ে, পুকুরে, বাঁধে বা ঝিলে এবং শতকরা মাত্র একভাগ জল মাটির নীচে রয়েছে। সাধারণভাবে জলকে আমরা গৃহস্থালির নানা কাজে যেমন পান করা, রান্না, স্নান, শৌচকর্ম, জামাকাপড় কাচা, বাসনপত্র ধোয়া, গৃহপালিত জীবজন্তু প্রতিপালন, কৃষিকাজ ও কলকারখানার কাজে ব্যবহার করে থাকি। দেখা যাচ্ছে, কৃষিকাজে, খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য কমপক্ষে শতকরা ৮০ শতাংশ জল, কলকারখানা ও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য শতকরা ১০ শতাংশ জল, পানীয় হিসেবে শতকরা ৫ শতাংশ জল ও বাকিটা অন্যান্য বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়। এর সিংহভাগ জল মাটির তলা থেকে উত্তোলন করা হয়। এই ভূগর্ভস্থ জল বেহিসাবি ব্যবহারের ফলে দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে জলসংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে ক্রমশ।

অপরিকল্পিত ভাবে ভূগর্ভস্থ জল ব্যবহারের দরুন জলস্তর নেমে যাচ্ছে। ফলে কীভাবে জল সংরক্ষণ ও তা পুনর্ব্যবহার করা যায় তা নিয়ে ভাবিত গোটা বিশ্ব। জলের সমস্যার মধ্যে প্রধান সমস্যা হল তার গুণগতমান। কারণ পৃথিবীতে রোগের সংখ্যা যদি একশো হয় তা হলে তার মধ্যে আশিটি রোগের বাহক হচ্ছে জল। শিল্প কারখানায় ও মানুষের বসতিতে ব্যবহৃত অপরিশোধিত জল দূষিত করে চলেছে ব্যবহারযোগ্য জলকে। থাকছে ব্যাকটেরিয়া, লোহা, তামা, সিসা, পারদ দস্তা, ক্যাজমিয়াম, ফ্লোরাইড, কার্বোনেট ইত্যাদি এবং তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত গরমজল। গুণগতমানে ভূগর্ভস্থ জলে আরও কয়েকটা যৌগ থাকছে যেমন- আর্সেনিক, ফ্লুরাইড।ব্যবহারযোগ্য জলকে সরকারি উদ্যোগে পরিশোধন করা ছাড়াও আমাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে বা সমষ্টিগতভাবে উদ্যোগ নিতে হবে জল পরিশোধন ও সংরক্ষণের জন্য। বিশেষভাবে জলের সুষ্ঠু পরিচালন ও সংরক্ষণের জন্য মহিলাদের সক্রিয় সহযোগিতার খুবই দরকার। বণিকসভার জল দিবস পালনের আসরেও তাই রাজ্য সরকারের ‘জল ধরো জল ভরো’র বার্তাই উঠে এসেছে।

গুরুনানক ইন্সটিটিউট অব ফার্মাসিউটিকাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির বায়োটেকনোলজি বিভাগের প্রধান, পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. স্বাতী নন্দী চক্রবর্তী বলেন, ভূপৃষ্ঠ বা ভূগর্ভস্থ জল যা পাওয়া যাচ্ছে তার পরিমাণ কিন্তু অসীম বা অনন্ত নয়। জলের স্তর নেমে যাওয়া ছাড়াও আর্সেনিক, ফ্লুরাইড জাতীয় যৌগকল্পের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। ফলে ধান, গম এবং সবজিতেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এখন দরকার ভূগর্ভস্থ জলের পুনর্নবীকরণ ও সংরক্ষণ। বৃষ্টির জল রাখার সুষ্ঠু পরিকল্পনা। পূর্ব কলকাতার বিস্তীর্ণ জলাভূমি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাও বোঝান তিনি। বিভিন্ন পদ্ধতিতে জলের সংরক্ষণ ও পরিচালনের মাধ্যমে জল নামক জীবনদায়িনী শক্তিকে আমরা বাঁচিয়ে রাখতে পারব বলে আশাপ্রকাশ করেছেন সেমিনারে উপস্থিত বিশিষ্টজনেরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here