ফি-হপ্তায় নিজের অজান্তেই আপনি খাচ্ছেন অন্তত ৫ গ্রাম প্লাস্টিক

0
1291
plastic

শ্যামলেশ ঘোষ: আপনি কী জানেন, আপনার পেটে এখন প্লাস্টিকের চরা পড়ছে? জানেন কী, প্রতিসপ্তাহে একটা ক্রেডিট কার্ডের সমান প্লাস্টিক উদরস্থ করছেন আপনি? নিজের অজান্তেই অন্তত ৫ গ্রাম প্লাস্টিক আপনি খাচ্ছেন স্যার। এর জন্য মূলত দায়ী আপনার প্লাস্টিকের জলের বোতল এবং ট্যাঙ্ক-পাইপ ও ট্যাপ-কল। এমনকী নুন, মাছ আর আপনার সাধের বিয়ার থেকেও প্লাস্টিক ঢুকছে আপনার শরীরে। ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড (ডব্লিউডব্লিউএফ) অনুমোদিত এই প্রকল্পে গবেষণা চালিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার নিউক্যাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। তাদের ‘নো প্লাস্টিক ইন নেচার: অ্যাসেসিং প্লাস্টিক ইনজেসন ফ্রম নেচার টু প্রোজেক্ট’ নামক রিপোর্টে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। তাতেই প্রথমবার জানা গিয়েছে, একজন মানুষ বছরে গড়ে প্রায় আড়াইশো গ্রাম প্লাস্টিক ভক্ষণ করছে।

plasticকীভাবে প্লাস্টিক ঢুকছে আমাদের শরীরে? গত কয়েক দশকে আমাদের জীবনযাত্রার ধরন পাল্টে গিয়েছে। ধাতু বা পাকা জলের ট্যাঙ্কের বদলে বাড়ি-বাড়ি এখন প্লাস্টিকের জলের ট্যাঙ্ক। ধাতুর পাইপের বদলে জলের লাইনে প্লাস্টিকের পাইপ। ধাতু বা মাটির ঘড়া-কলস-কুঁজোর বদলেকে প্লাস্টিকের জারিকেন বা ড্রামে ভরা থাকছে জল। ইচ্ছেমতো জল গড়িয়ে নেওয়ার জন্য ফিল্টার লাগানো বা ফিল্টারহীন ট্যাপ-কলযুক্ত জলপাত্রটিও প্লাস্টিকের। প্লাস্টিকের বোতলে জল ভরে রাখছেন বাড়িতে-অফিসে। গ্লাস বা ঘটির দরকারই নেই, ইচ্ছে হলেই বোতলের ছিপি খুলে জলপান করা যাচ্ছে। দোকান-বাজার থেকেও প্লাস্টিকের বোতলে ভরা জল বা অন্য কোনও পানীয় কিনে ঢকঢক করে গলায় ঢালা সহজ। তার পর সেই প্লাস্টিকের বোতলটি টুপ ফেলে দিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর। আবার অনেকক্ষেত্রে সেই বোতলের পুনর্ব্যবহার হচ্ছে। এই প্রতিটি ক্ষেত্রে কণা-কণা প্লাস্টিক ঢুকছে আমাদের পেটে। আমরা টেরও পাচ্ছি না।

plasticআবার আমাদের কুঅভ্যাসের ফলে এই প্লাস্টিক ঘুরপথে আমাদের শরীরে ঢুকে পড়ছে। কীভাবে? বর্তমান সময়ে আমরা চাই বা না-চাই আমাদের জীবনযাপনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে প্লাস্টিক-পলিথিন। যেকোনও খাদ্য বা পানীয় এখন প্যাকেটজাত হয়ে বাজারে আসে। সেই খাবার বা পানীয়ের মোড়ক হোক বা পাত্র এবং শিশি-বোতল সবই প্লাস্টিকের। পরিবেশ সচেতনতাহীন অধিকাংশ মানুষ সেই প্লাস্টিকের প্যাকেট বা বোতল কোথায় ফেলেন? যেখানে খাচ্ছেন, সেখানেই। নিজের জমিতে, প্রতিবেশীর জমিতে, সরকারি জমিতে, দোকান-পাটে, বাজার-হাটে, রাস্তাঘাটে, ফুটপাতে-রেললাইনে, ট্রেনে-বাসে যত্রতত্র সেই প্লাস্টিকের জঞ্জাল ফেলে দিচ্ছেন অপরিণামদর্শী লোকজন। তার পর সেই সব প্লাস্টিক-পলিথিন থেকে ভয়ানক দূষণ ছড়াচ্ছে মাটিতে, জলে এবং বাতাসে। আবার পড়ে থেকে থেকে রোদ-জলে ভাঙছে সেগুলি। প্লাস্টিকের টুকরো এবং প্লাস্টিক-কণা নর্দমা, খাল, নদী হয়ে সমুদ্রে গিয়ে মিশছে। মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক খাবারের মাধ্যমে ফের সেই প্লাস্টিক-কণা ফিরে আসছে আমাদেরই পেটে।

plasticআমাদের প্লাস্টিক-প্রীতি প্রবল। নিত্যব্যবহার্য সমস্ত বাসনপত্রও ইদানীং প্লাস্টিকের। তাতে খাবার-দাবার, মশলাপাতি, তরিতরকারি রাখা বা খাবার গরম করার পাত্র সবই আছে। আবার দাঁতের মাজন থেকে প্রসাধনী, সবেতেই প্লাস্টিক। বলা ভাল মাইক্রোপ্লাস্টিক। ৫ মিলিমিটারের চেয়ে কম আকারের ক্ষুদ্র প্লাস্টিকের অংশকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। যা খালিচোখে দেখা যায় না। এই প্রসাধনীর প্লাস্টিক-কণা একদিকে যেমন আমাদের শরীরে সরাসরি ঢুকছে, তেমনই জলবাহিত হয়ে চলে যাচ্ছে সমুদ্রেও। মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক খাদ্য ছাড়াও নুনে মিশে থাকছে সেই প্লাস্টিক। আরও আছে। সিন্থেটিক জামাকাপড়, গাড়ির টায়ার থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়ায় পরিবেশে। এমনকী মধু বা বিয়ারে প্রচুর সিন্থেটিক থাকে। এছাড়াও ঘর সাজাতে ব্যবহার করা পর্দা থেকে প্রায় সমস্ত জিনিস থেকে প্লাস্টিক-কণা ছড়িয়ে পড়ে। খাবারের সঙ্গে মিশে তার গন্তব্য হয় আমাদের জঠর।

plasticএই প্লাস্টিক-বিষ আমাদের পরিবেশের পাশাপাশি মানবদেহেও যে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে, তাতে সন্দেহ নেই। ডব্লিউডব্লিউএফ-এর আন্তর্জাতিক ডিরেক্টর জেনারেল মার্কো ল্যামবার্টিনি বলেছেন, ‘মানুষের পেটে যে পরিমাণ প্লাস্টিক ঢুকছে, তার ফল মারাত্মক। এই অনুসন্ধান বিভিন্ন দেশের কাছে সতর্ক হওয়ার বার্তা দিচ্ছে। প্লাস্টিক দূষণ যে শুধু আমাদের নদী বা সমুদ্রকে দূষিত করছে তাই নয়, এটা সামুদ্রিক জীবজগতে ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলেছে। পরিস্থিতি এখন এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে, না চাইলেও এখন আমাদের নিত্য প্লাস্টিক গিলতে হবে। আমরা যদি আমাদের শরীরে প্লাস্টিকের অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে চাই, তা হলে প্লাস্টিকের ব্যবহার ও অপব্যবহার (ছড়ানো) বন্ধ করতে হবে। প্লাস্টিক-দূষণ বন্ধে আন্তর্জাতিক মহলকে দ্রুত জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে এবং তৎপরতার সঙ্গে এই সংকটের মোকাবিলা করতে হবে।’ এই লক্ষ্যে বিশ্বের প্রতিটি দেশের ওপর চাপ বাড়াতে ৫ লক্ষ স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছে ডব্লিউডব্লিউএফ।

plasticপ্লাস্টিকের বিষ শরীরে ঢুকলে তা ‘হজম’ করার সাধ্যি নেই মানুষের। তাই পরিবেশবিদরা বলছেন, বেনিয়াদের সঙ্গে রাজনেতাদের আর্থিক স্বার্থ জড়িত। ফলে প্লাস্টিক বা পলিথিনের জিনিসপত্রের উৎপাদন বন্ধ করা সাধারণ মানুষের পক্ষে দুরূহ। কিন্তু এই প্লাস্টিক-পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করতে পারি আমরা। প্লাস্টিক বন্ধে প্রশাসনের ওপর, সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে আমরা জনগণ সোচ্চার হতে পারি। যারা প্লাস্টিক-আবর্জনা ফেলে-ছড়িয়ে সমাজকে ও পরিবেশকে কলুষিত করছেন, সমবেত ভাবে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারি। চট করে ফেলে না দিয়ে খাবার বা জল খাওয়ার পর প্যাকেট-বোতল ইত্যাদি সঙ্গে বইতে পারি। পরে সুযোগ-সুবিধামত ডাস্টবিনে ফেলতে পারি সেই জঞ্জাল। কারণ কথায় আছে, আপনি আচরি ধর্ম অপরে শিখাও। আমরা কেউ কিন্তু ‘নীলকণ্ঠ’ নই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here